ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের রপ্তানিতে উল্টো রথে প্রযুক্তি খাত : সিপিডি

২২ অক্টোবর, ২০২৩ ২১:৫৪  

উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে এবং পণ্যে বৈচিত্র্য আনার জন্য শিল্পকারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের বিকল্প নেই। কিন্তু এসব আধুনিক প্রযুক্তি পরিচালনায় দক্ষ জনশক্তির যথেষ্ট অভাব রয়েছে। দক্ষ কর্মী তৈরিতে যে ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণা দরকার, তাও অপর্যাপ্ত। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় করতে চায় না। বেশির ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বছরে এ ক্ষেত্রে শ্রমিকপ্রতি ৫০০ টাকারও কম অর্থ ব্যয় করে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধা নিতে হলে গবেষণা খাতে জোর দেওয়া জরুরি।

রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশের শিল্প খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার’ রোববার অনুষ্ঠিত সংলাপ অনুষ্ঠানে এমন অভিত তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ সংলাপের আয়োজন করে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। আলোচনায় অংশ নেন ইউনাইটেড নেশন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইউএনআইডিও) বাংলাদেশ প্রতিনিধি জাকি উজ জামান, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির, বিজিএমইএর পরিচালক আসিফ আশরাফসহ বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তারা।

অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী বলেন, সময়মতো প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ না করলে, ভালো গবেষণা না হলে শিল্প খাত পিছিয়ে যাবে, দেশও পিছিয়ে পড়বে। এখনও প্রয়োজনীয় অনেক ক্ষেত্রে সঠিক বিনিয়োগ হচ্ছে না। বৈদেশিক বিনিয়োগ সেভাবে আসছে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানে অসন্তোষ প্রকাশ করেন শিল্পমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কী পড়ানো হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষার্থীরা শুধু সনদপত্র পাচ্ছে। চাকরির পরীক্ষায় তারা টিকতে পারছে না। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হলে শিক্ষায় কোনোভাবে ছাড় দেওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকরা রেমিট্যান্স পাঠান। আর উচ্চ শিক্ষিত ব্যবসায়ীরা রেমিট্যান্স তো পাঠান না, উল্টো দেশ থেকে টাকা নিয়ে যান। কোরবানির সময় অনেক চামড়ার জোগান হয়। কিন্তু বিক্রি হয় না। ট্যানারিতে চামড়া পড়ে থাকে। সেগুলো বর্জ্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ, কিছু ব্যবসায়ীর এখন অনেক টাকা, তারা বিদেশে থাকেন। তাদের কিছু হয়ও না। কারণ, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা কিংবা মন্ত্রীর সঙ্গে তাদের খাতির থাকে। একশ্রেণির ব্যবসায়ী ব্যাংকের টাকা খেয়ে ফেলছেন, মানুষের টাকাও খেয়ে ফেলছেন। আসলে অসততাই মূল সমস্যা।

মূল প্রবন্ধে সিপিডির গবেষণা ফেলো সৈয়দ ইউসুফ সাদাত বলেন, শিল্প খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য ভালো মানের গবেষণা ও উদ্ভাবন দরকার। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে একেবারেই ব্যয় করতে চায় না। ওষুধ, চিকিৎসা ও রাসায়নিকের মতো কয়েকটি শিল্প ছাড়া বেশির ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বছরে প্রতি শ্রমিকের পেছনে ৫০০ টাকারও কম ব্যয় করে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ করেছে। আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ করেছে যথাক্রমে ২ ও ১ শতাংশ। বিষয়টি দেশের শিল্প খাতের জন্য অশনিসংকেত।

অনুষ্ঠানে ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য শিল্প খাতে উচ্চ মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করতেই হবে। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সারাবিশ্বে যেভাবে বিপ্লব হচ্ছে, তাতে এর সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বাংলাদেশ পিছিয়ে যাবে। অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়বে। তৈরি পোশাক খাত ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কোনো রপ্তানি খাত নেই। পোশাক খাতেও খুব ভালো প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে না।

জাকি উজ জামান বলেন, রপ্তানি বাড়াতে হলে হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। সেজন্য উচ্চতর গবেষণা খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ বিনিয়োগ হতে হবে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ।

প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসএমই থেকে শুরু করে সাপ্লাইচেইনে ইন্টারনেট অব থিংকস ব্যবহার করলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির। তিনি জানান, ম্যানুয়েল লেবার ছাড়াও কগনেটিভ ওয়ার্কও মেশিন করবে। তাই পোশাক শিল্পে প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। তবে কারখানায় রোবট ব্যবহারারের ক্ষেত্রে একটি ন্যাশনাল রোবটিকস পলিসি তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়াদের এগিয়ে আসতে হবে।

সৈয়দ আলমাস কবির বলেন, মেগা প্রকল্পে যেসব প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার হয়েছে বা এখনও হচ্ছে, তার ছিটেফোটা কাজ যদি দেশের কোম্পানিগুলো পেত, তাহলে এখানকার কোম্পানিগুলো দাঁড়িয়ে যেত। বলছি না যে, বিদেশ থেকে প্রযুক্তি আনা যাবে না। তবে এসব প্রকল্প যখন শুরু হয়, তখন চুক্তিতে ন্যূনতম ৬০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত দেয়া উচিত ছিল। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য ব্লকচেইন, আইওটির মতো বিষয়ে জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন। ডাটা প্রাইভেসি আইনকে দ্রুত আলোর মুখ দেখাতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে এখন অ্যাপল’র চিপও নকশা করে। তাই আমাদের রোবটিক পলিসির পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর পলিসিও করতে হবে। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর অপব্যবহাও হবে। নতুন ধরণের সেসব অপরাধ বিষয়ে এখন থেকেই আইনগুলো হালনাগাদ করতে হবে। একইসঙ্গে ডেমোগ্রাফিক ডেফিডেন্ড পেতে জ্ঞান ও দক্ষতার একটি ম্যারেজ তৈরি করতে হবে। এজন্য গতকালই আমাদের একটি পলিসি করা দরকার ছিলো। এক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি।

আসিফ আশরাফ বলেন, বড় কারখানাগুলোতে অটোমেশন হচ্ছে। ছোট কারখানাগুলো এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। ছোটদের ব্যবসায় অটোমেশন যুক্ত করতে সরকারের নীতি সহায়তা দরকার।

 বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্যান্য দেশের রপ্তানিতে ম্যানুফ্যাকচারিং পণ্যের মধ্যে মধ্য ও উচ্চপর্যায়ের প্রযুক্তিপণ্যসহ অন্যান্য ধরনের পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। বাংলাদেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে মোট রপ্তানির মধ্যে মধ্যম ও উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের অনুপাত মাত্র দুই শতাংশ। অথচ ১৯৯০ সালের দিকেও মধ্যম ও উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের অনুপাত ছিল ছয় শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে তুলনাযোগ্য অন্যান্য দেশগুলোর রপ্তানি পণ্যে প্রযুক্তি খাতের অবদান ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশে সেটি হচ্ছে না।